মোঃ মোশাররফ হোসেন, ছাতক(সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি।।
সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার গোবিন্দগঞ্জ এলাকায় হাটবাজার উন্নয়নের সুবাদে একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কোটি টাকা বানিজ্যের অভিযোগ উটেছে। ছাতক-সিলেট সড়ক সংলগ্ন সরকারি জমিতে প্রায় একশ’র বেশি ভিটা বন্দোবস্ত দেওয়ার নামে ভিটাপ্রতি ৩ থেকে ৪ লাখ টাকা করে হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
স্থানীয় একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট প্রশাসনের সহযোগিতায় ভিটা পাইয়ে দেওয়ার নামে এসব টাকা উত্তোলন করছে বলে একাধিক সূত্রে জানা গেছে। এ নিয়ে পুরো উপজেলায় চলছে ব্যাপক তোলপাড়।
গোবিন্দগঞ্জ এলাকার পূর্ব রামপুর মৌজার (জে.এল. নং ২৪৬) ১নং সরকারি খতিয়ানভুক্ত ভূমিতে বন্দোবস্তের আগেই প্রায় এক মাস ধরে ভিটা তৈরির কাজ চলছে। নামমাত্র টাকায় বন্দোবস্ত দেওয়ার কথা থাকলেও অসাধু চক্রটি এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে প্রায় দেড় কোটি টাকার বাণিজ্যে মেতে উঠেছে। এতে স্থানীয় মৎস্যজীবী ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।
ভূমি বন্দোবস্তের বিষয়টি জানাজানি হতেই পার্শ্ববর্তী সরকারি জমিগুলোর বন্দোবস্ত দাবি উঠেছে, ফলে এলাকায় সৃষ্টি হয়েছে পক্ষ-বিপক্ষ বিভাজন। এ নিয়ে কবরস্থান ও ঈদগাহের জমি বন্দোবস্ত দাবি করায় ব্যবসায়ী জহির হোসেনের বিরুদ্ধে থানায় চাঁদাবাজির অভিযোগ দায়ের হয়। তার প্রতিবাদে গত ২১ অক্টোবর গোবিন্দগঞ্জে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। এ ঘটনায় বিপরীত পক্ষও পাল্টা কর্মসূচির প্রস্তুতি নিচ্ছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা-এ নিয়ে যেকোনো সময় দাঙ্গা-হাঙ্গামার সৃষ্টি হতে পারে।
সূত্র জানায়, গত ৮ আগস্ট উপজেলা সম্মেলন কক্ষে হাটবাজার রক্ষণাবেক্ষণ ও উন্নয়ন সংক্রান্ত এক সভায় নয়টি প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়। এর মধ্যে গোবিন্দগঞ্জ নতুনবাজারের পূর্ব ও পশ্চিম অংশ সংস্কারের জন্য চার লাখ টাকা এবং দুটি ফিশ সেড নির্মাণে ১০ লাখ টাকা বরাদ্দসহ মোট চার প্রকল্পে ১৪ লাখ টাকা অনুমোদন দেওয়া হয়। পরে দরপত্রের মাধ্যমে বাজার উন্নয়নে আরও দুইটি প্রকল্পে ১০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। মোট ছয়টি প্রকল্পে ২৪ লাখ টাকা বরাদ্দ থাকলেও স্থানীয় সিন্ডিকেট চক্র ভিটা পাইয়ে দেওয়ার নামে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ৩ থেকে ৪ লাখ টাকা করে দেড় কোটি টাকার বেশি অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এদিকে, উপজেলার হাটবাজার এডিপি এবং অন্যান্য উন্নয়নমূলক কাজের আরএফকিউ ও পিআইসি দরপত্র প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগে স্থানীয় ঠিকাদাররা উপজেলা প্রকৌশলী বরাবরে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। তারা অভিযোগ করেছেন, দরপত্র প্রক্রিয়া স্বচ্ছ না রেখে পছন্দমত প্রভাবশালী মহলের অধিনে এসব কাজ করানো হচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গোবিন্দগঞ্জ পুরানবাজার এলাকায় একটি মাছ বাজার আছে, এছাড়া দীর্ঘদিন ধরে নতুন বাজার এলাকার সরকারি রাস্তাসহ বিভিন্ন স্থানে মাছের বাজার চলছে। সম্প্রতি গোবিন্দগঞ্জ মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশে জেলা প্রশাসকের ১নং খতিয়ানভুক্ত ভূমিতে মৎস্য ব্যবসায়ীদের জন্য ৩টি সেডে ৬০টি ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, জুলাই যুদ্ধা, প্রতিবন্ধী ও হিজড়াদের নামে ৪০টি দোকান ভিটা নির্মাণের উদ্যোগ নেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. তারিকুল ইসলাম। আর এসব কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করছে গোবিন্দগঞ্জ মৎস্য ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের অভিযোগ-একটি সিন্ডিকেট নামাত্র ৪-৫ জন প্রতিবন্ধী, হিজড়া ও জুলাইযুদ্ধার নাম সামনে রেখে ওই প্রকল্পের সুযোগ কাজে লাগিয়ে ভিটাপ্রতি ৩ থেকে ৪ লাখ টাকায় বিক্রি করছে। ইতিমধ্যে প্রায় ৩০টি ভিটার জন্য টাকা লেনদেনও সম্পন্ন হয়েছে বলে জানা গেছে। অর্থের বিনিময়ে দোকান বরাদ্দের একাধিক অডিও-ভিডিও স্থানীয় সাংবাদিকদের হাতে এসেছে, যেখানে কয়েকজন ব্যবসায়ী ৭ থেকে ১১ লাখ টাকার বিনিময়ে ২-৩টি করে ভিটা ক্রয় বিক্রয়ের আলোচনা শুনা যাচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয়দের দাবি—এভাবে মোট প্রায় দেড় কোটি টাকার বাণিজ্য হয়েছে। প্রতিবাদকারীদের নানাভাবে হুমকি ও হয়রানি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ফলে সরকারি জায়গার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও উচ্ছেদের আতঙ্কে ভুগছেন এবং অনেকেই টাকার বিনিময়ে জায়গা কিনতে বাধ্য হচ্ছেন।
অভিযোগের বিষয়ে মৎস্য ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সভাপতি নুরুল ইসলাম বলেন, “ভিটা পেতে প্রায় একশত জন আবেদন করেছেন। সরকার নির্ধারিত রাজস্ব, খাজনাসহ অন্যান্য খরচ মিলে জনপ্রতি ১০-১৫ হাজার টাকা লাগতে পারে। ৩-৪ লাখ টাকার কথা আমি জানি না। বিষয়টি ইউএনও সাহেব ভালো জানেন।”
সমিতির সাধারণ সম্পাদক শাহাজান মিয়া বলেন, “এ বিষয়ে বিস্তারিত সভাপতি জানেন, আমার কাছে কোনো তথ্য নেই।”
উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) সঞ্জয় ঘোষ বলেন, “আমি সরকারি নীতিমালার বাইরে কোনো ফাইলে স্বাক্ষর করিনি। নতুন এসিল্যান্ড দায়িত্ব গ্রহণের পর বিষয়টি দেখবেন।”
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. তরিকুল ইসলাম বলেন, “সরকার ব্যবসায়ীদের জন্য শেড নির্মাণ করছে এবং এখান থেকে কেবল সরকারি নির্ধারিত অর্থই নেওয়া হচ্ছে। অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার প্রশ্নই আসে না। দোকান বরাদ্দের নামে যদি কেউ টাকা লেনদেন করে থাকে, তাহলে তা খতিয়ে দেখা হবে।