প্রিন্ট এর তারিখঃ ফেব্রুয়ারী ৭, ২০২৬, ৩:৪১ পি.এম || প্রকাশের তারিখঃ অক্টোবর ৩০, ২০২৫, ১১:৫০ এ.এম

মোঃ আনিছুল ইসলাম রাজিব লালমনিরহাট প্রতিনিধি।।
লালমনিরহাট জেলা মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রে (এমসিএইচ-এফপি) বিপুল পরিমাণ সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে প্রায় ২৫ লাখ ৯ হাজার ৩৬৫ টাকা ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে তুলে আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।এই অর্থ আত্মসাতে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে তৎকালীন মেডিকেল অফিসার (ক্লিনিক) ডা. নিশাত উন নাহার এবং অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক মনোয়ারা বেগমের বিরুদ্ধে।
পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. শাহজালাল স্বাক্ষরিত এক পরিদর্শন প্রতিবেদনে এই অনিয়মের বিস্তারিত উঠে এসেছে। প্রতিবেদনটি ইতিমধ্যে পরিচালক (প্রশাসন), পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর, ঢাকা-এর কাছে পাঠানো হয়েছে পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, একাধিকবার কেন্দ্র পরিদর্শন করেও বরাদ্দকৃত অর্থে কেনা কোনো মালামাল বা যন্ত্রপাতির অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্ট কর্মচারীরা স্টক রেজিস্টার বা বিতরণ রেজিস্টার দেখাতেও ব্যর্থ হন।
সরকারি নীতিমালা উপেক্ষা করে ওষুধ সংগ্রহ ও এমএসআর খাতে ১০ লাখ ৪৯ হাজার ৯৯০ টাকা উত্তোলন করা হলেও কেন্দ্রে বাস্তবে অতি অল্প পরিমাণ ওষুধ মজুত পাওয়া যায়।
চিকিৎসা যন্ত্রপাতি ও আসবাবপত্র মেরামতের নামে উত্তোলন করা ৩ লাখ ৭০ হাজার টাকার কোনো প্রমাণও পাওয়া যায়নি।
অ্যাম্বুলেন্সের পেট্রোল, লুব্রিকেন্ট ও মেরামত খাতে মোট ৩ লাখ ৬৯ হাজার ৩৭৫ টাকা ব্যয় দেখানো হলেও, ড্রাইভারের দাবি—বিগত দুই থেকে তিন বছরে অ্যাম্বুলেন্সটি মেরামত করা হয়নি। বরং এটি ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করা হয়েছে।
কম্পিউটার সামগ্রী ক্রয় ও মেরামতের খাতে ১ লাখ ৩৬ হাজার টাকা এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা খাতে ১ লাখ ৩২ হাজার টাকা ব্যয়ের দেখানো হলেও কোনো প্রমাণপত্র উপস্থাপন করতে পারেননি অফিস সহকারী মনোয়ারা বেগম।
পরিদর্শনের সময় নিম্নপদস্থ কর্মচারীরা অভিযোগ করেন, হিসাব শাখার দায়িত্বে থাকা মনোয়ারা বেগম প্রয়োজনীয় উপকরণ সরবরাহ করেন না।
উপপরিচালক বিল-ভাউচার দেখতে চাইলে তিনি জানান, “আলমারির চাবি ভুলে বাড়িতে রেখে এসেছেন।” পরে আংশিক কাগজপত্র দেখালেও তা নিয়মবহির্ভূত ছিল।
উপপরিচালক শাহজালালের প্রতিবেদনে নিশ্চিত করা হয়েছে, ভূয়া বিল ভাউচারের মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে।
তিনি জানান, শুধু চলতি অর্থবছর নয়, গত চার বছরেও একইভাবে বিপুল পরিমাণ অর্থ লোপাট হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর ইতিমধ্যে পুরো ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে। ঢাকা থেকে একটি বিশেষ নিরীক্ষা টিম গঠনের প্রক্রিয়াও চলছে বলে জানা গেছে।
অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে অফিস সহকারী মনোয়ারা বেগম বলেন, “আমাকে বিল তৈরি করতে বলা হয়েছিল, তাই করেছি। বিল সঠিক কি না, সেটা দেখা আমার দায়িত্ব নয়।”
অন্যদিকে ডা. নিশাত উন নাহার বলেন, “আমি দীর্ঘদিন ধরে লালমনিরহাটে সেবা দিয়ে আসছি। কিছু অডিট আপত্তি থাকলে তা সমাধানযোগ্য। চার-পাঁচ লাখ টাকার অমিল নিয়ে এত কথা হচ্ছে, অথচ অন্য দপ্তরে কোটি টাকার গরমিল থাকে।”
উপপরিচালক মো. শাহজালাল বলেন, ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রায় ২৫ লাখ টাকা নয়, গত চার বছরের আর্থিক লেনদেন ও মালামাল ক্রয়ের নামে আরও লক্ষাধিক টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। পুরো ঘটনাটি তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য প্রতিবেদনটি ঢাকায় পাঠানো হয়েছে।”
স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা এই ঘটনাকে “পদ্ধতিগত দুর্নীতি” হিসেবে আখ্যা দিয়ে দ্রুত দোষীদের শাস্তি দাবি করেছেন।