আবু ইউসুফ নাঈম, জামালগঞ্জ (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি।।
সুনামগঞ্জ জেলার হাওরাঞ্চল জামালগঞ্জ উপজেলা—ধান ও মাছের ভাণ্ডার হিসেবে খ্যাত হলেও শিক্ষা ক্ষেত্রে এই জনপদ ভয়াবহভাবে পিছিয়ে রয়েছে। স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরও উপজেলাটির ছয়টি ইউনিয়নের অন্তত ১৩টি গ্রামে নেই কোনো সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এর ফলে প্রায় তিন হাজার শিশু মৌলিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়ে নিরক্ষরতার অন্ধকারে ডুবে আছে।
বিদ্যালয়বিহীন গ্রামগুলো
জামালগঞ্জ উত্তর ইউনিয়নের মমিনপুর (পরিবার সংখ্যা-২৬৩, জনসংখ্যা-১,৩৮২ জন), উত্তর লক্ষ্মীপুর (৯৪ পরিবার, জনসংখ্যা-৬১১ জন), হোসেনপুর (১৩৩ পরিবার, জনসংখ্যা-৭১৪ জন), ইনসানপুর (৭৩ পরিবার, জনসংখ্যা-৪১৮ জন), ঝুনুপুর ও মাছুমপুর (৬৪ পরিবার, জনসংখ্যা-৩২৩ জন), মুসলিমপুর (৩২ পরিবার, জনসংখ্যা-১৪৩ জন), সদরকান্দি (২১৯ পরিবার, জনসংখ্যা-১,১৬৭ জন);
ফেনারবাঁক ইউনিয়নের রসুলপুর (১২১ পরিবার, জনসংখ্যা-৭৫১ জন), যশমন্তপুর (১১৯ পরিবার, জনসংখ্যা-৬৫৪ জন);
সাচনা বাজার ইউনিয়নের নজাতপুর (১৫১ পরিবার, জনসংখ্যা-৮০৯ জন), নুরপুর আশ্রয়ন প্রকল্প (২৬০ পরিবার, জনসংখ্যা-১,৩১৯ জন);
ভীমখালি ইউনিয়নের চান্দেনগর (১৪৫ পরিবার, জনসংখ্যা-৭৪৭ জন)।
জামালগঞ্জ উপজেলা পরিসংখ্যান অফিসের সর্বশেষ তথ্য (২০২২ সালের জনশুমারি) অনুযায়ী, ১৩টি গ্রামে মোট পরিবার সংখ্যা ১,৬৭৪ এবং জনসংখ্যা ৯,০৩৮ জন। এর মধ্যে প্রায় তিন হাজার শিশু-কিশোর প্রাথমিক শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত।
বিদ্যালয় না থাকায় অধিকাংশ শিশু মসজিদের মক্তবে সামান্য পড়াশোনা করার পর কৃষিকাজ, নৌকায় মাছ ধরা কিংবা বিভিন্ন শিশুশ্রমে যুক্ত হচ্ছে। ফলে প্রাথমিক শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হয়ে অন্ধকার ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে তাদের।
মমিনপুর গ্রামের ১০ বছরের রিমা আক্তার জানায়— আমি ডাক্তার হতে চাই। কিন্তু স্কুল ছাড়া কীভাবে পড়ব?
রসুলপুরের ১২ বছরের সোহান বলে— মামার বাড়ির শিশুরা স্কুলে যায়, আমরা যাই না। আমাদের তো স্কুল নাই।
নজাতপুরের ৯ বছরের রাহাত কাঁদতে কাঁদতে বলল— বাবা বলছে পড়াশোনা বাদ দিয়ে বাড়ির কাজে লাগব। কিন্তু আমি কাজ করতে চাই না, মাস্টার হতে চাই।
চান্দেনগর গ্রামের ১৩ বছরের রাশিদুল ইসলাম বলল— স্কুল থাকলে হাওরে মাছ ধরতে হতো না।
অভিভাবকদের ক্ষোভ
অভিভাবকরা জানান, বহুবার জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের কাছে বিদ্যালয় স্থাপনের দাবি জানালেও কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ফলে শিশুশ্রম, বাল্যবিবাহ ও মাদকাসক্তির মতো সামাজিক সমস্যা দিন দিন বাড়ছে।
মমিনপুর গ্রামের কাদির মিয়া বলেন— আমাদের গ্রামে শত শত শিশু পড়তে চায়, কিন্তু স্কুল নেই। আমরা হয়তো মরে যাব, কিন্তু স্কুল দেখে যেতে পারব না।
নুরপুর গ্রামের ৭৫ বছরের জাহিদা বেগমের আক্ষেপ— প্রতিটি নির্বাচনে স্কুল দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়, কিন্তু কেউ রাখে না।
চান্দেনগরের শহিদুল ইসলাম বলেন— বিদ্যালয় না থাকায় আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার। আমরা স্কুল চাই।
জমি নিয়ে জটিলতা,
জামালগঞ্জ উত্তর ইউনিয়নের মমিনপুর গ্রামে ২০০০ সালে গ্রামবাসী ৩৩ শতক জমি কিনে ‘মমিনপুর বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়’-এর নামে নামজারি করেন। কিন্তু স্থানীয় প্রভাবশালী মহল দীর্ঘদিন ধরে জমিটি দখল করে রেখেছে। এ ঘটনায় গ্রামবাসীর পক্ষ থেকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগও দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে একসময় দাতা সংস্থা এফআইডিভি (FIDV) এর উদ্যোগে উত্তর ইউনিয়নে তিনটি বিদ্যালয় স্থাপিত হলেও বর্তমানে সেগুলো কার্যক্রমহীন। বিদ্যালয় ভবনগুলো স্থানীয়রা দখল করে বসতি স্থাপন করেছেন।
লক্ষীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জানান— বিদ্যালয়বিহীন গ্রামগুলোতে অন্তত প্রতি ৩০০ শিশুর জন্য একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় জরুরি। কিন্তু দূরত্ব ও যোগাযোগ সমস্যার কারণে শিশুরা নিয়মিত স্কুলে আসতে পারে না।
জামালগঞ্জ উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার পীযুষ কান্তি মজুমদার বলেন— মমিনপুরে বিদ্যালয়ের নামে জমি রয়েছে, এ বিষয়ে আমি অবগত। ২০২৩ সালে ৭টি বিদ্যালয়ের প্রস্তাবনা পাঠানো হলেও একটি বাস্তবায়িত হয়নি। আমি সরেজমিন পরিদর্শন করে নতুন প্রস্তাবনা পাঠাব। শিক্ষা ছাড়া বিকল্প নেই, তাই বিদ্যালয়বিহীন গ্রাম আমাদের জন্য দুঃখজনক।
সম্প্রতি প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ডা. বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দার বলেন— হাওরাঞ্চলে আবাসিক বিদ্যালয় নির্মাণের পরিকল্পনা থাকলেও শিক্ষকদের আগ্রহ না থাকায় তা বাস্তবায়িত হয়নি। তবে বিদ্যালয়বিহীন গ্রামগুলোতে দ্রুত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন ছাড়া বিকল্প নেই।
বিদ্যালয়বিহীন ১৩ গ্রামের শিশু-কিশোররা আজও মৌলিক শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত। স্থানীয়দের একমাত্র দাবি—যত দ্রুত সম্ভব এসব গ্রামে বিদ্যালয় স্থাপন করা হোক, যাতে নতুন প্রজন্ম অশিক্ষার অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আলোকিত ভবিষ্যৎ গড়তে পারে।